ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) বা এআই নিয়ে উন্মাদনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই এর অন্ধকার পিঠটি প্রকাশ পেল প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যামাজনে। একদিকে কোম্পানিটি ডেটা সেন্টার এবং এআই প্রযুক্তির পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে চলেছে, অন্যদিকে গত মাত্র আট মাসে কর্পোরেট স্তর থেকে প্রায় ৩০,০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করেছে। সংস্থার এই দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে এবার খোদ অ্যামাজনের কর্মীরাই প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেছেন। অ্যামাজনের সিইও (CEO) অ্যান্ডি জ্যাসির দাবি, সংস্থাকে আরও চটজলদি কাজের উপযোগী করতে এবং ম্যানেজমেন্টের বাড়তি স্তরগুলি কমিয়ে আনতেই এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। তবে কর্মীদের অভিযোগ, রক্তমাংসের কর্মীদের অগ্রাহ্য করে এআই-এর পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে কোম্পানি।
চলতি সপ্তাহে সিয়াটেল সিটি কাউন্সিলের একটি শুনানিতে এই বিতর্ক প্রকাশ্যে আসে। সেখানে অ্যামাজনের একদল ইঞ্জিনিয়ার বড় বড় এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনার সপক্ষে সাক্ষ্য দেন। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (AWS)-এর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্যাট্রিক শ্লোসার সরাসরি কোম্পানির এই ছাঁটাই নীতির সাথে এআই-এর বিপুল বিনিয়োগের সংযোগ টেনে বলেন, “গত আট মাসে কোম্পানির শীর্ষ নেতৃত্ব ৩০,০০০ কর্পোরেট কর্মীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা ছাঁটাই করেছেন। এর থেকে আমি এটাই বুঝতে পারছি যে, বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি যেভাবেই হোক এবং যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের কম্পিউটিং ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।” এই বিষয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘সিএনবিসি’ (CNBC)-র কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে অ্যামাজন কর্তৃপক্ষ অবশ্য দায়সারাভাবে জানিয়েছে, “জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মীদের মতামত প্রকাশের অধিকারকে আমরা সম্মান জানাই।”
এটি কেবল অ্যামাজনের একার চিত্র নয়। পুরো সিলিকন ভ্যালি জুড়েই এখন কর্মী ছাঁটাই করে এআই-এর পরিকাঠামো গড়ার হিড়িক লেগেছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে কেবল অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট (গুগল) এবং মেটা—এই চার সংস্থা মিলে এআই পরিকাঠামোয় প্রায় ৭০০ বিলিয়ন (৭০,০০০ কোটি) ডলার খরচ করতে পারে। এর মধ্যে শুধুমাত্র অ্যামাজনই ২০২৬ সালে তাদের মূলধনী ব্যয় হিসেবে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করার পূর্বাভাস দিয়েছে, যার একটি বিশাল অংশ ব্যয় হবে নতুন ডেটা সেন্টার তৈরি এবং উন্নত মানের এআই চিপ বা কম্পিউটিং ক্ষমতা তৈরিতে।
শুধু কর্মীরাই নন, এই দানবাকৃতির ডেটা সেন্টারগুলির কারণে ঘুম উড়ছে সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবিদদেরও। এই সেন্টারগুলি সচল রাখতে এবং ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার পানি এবং বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হয়, যা স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদে টান ফেলছে। ইতিমধ্যেই আমেরিকার ১৪টি রাজ্যের আইনপ্রণেতারা এই ডেটা সেন্টারগুলির সম্প্রসারণের ওপর লাগাম টানতে, কাজ পিছিয়ে দিতে বা কঠিন শর্ত আরোপ করতে বিল বা প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং কর্মহীন হয়ে পড়া সাধারণ মানুষ—এই তিনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আগামী দিনগুলিতে আরও তীব্র রূপ নিতে চলেছে বলেই মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
