ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: “সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থায় দেশের আদালতগুলি কেবল নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকতে পারে না। আইনি ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে গিয়ে সরকারি বা জনসাধারণের কোনো ক্ষমতা যাতে অপপ্রয়োগ না হয়, তা নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগকে সর্বদা সংবিধানের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে জাগ্রত থাকতে হবে।” সোমবার সুইডেনে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই মন্তব্য করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি (সিজেআই) সূর্য কান্ত।
‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স’ দ্বারা আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ‘আইনের শাসন রক্ষা — ভারত ও সুইডেনের অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন যে—আইনের শাসন আসলে ক্ষমতার অপপ্রয়োগকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিশ্চিত করে যাতে প্রতিটি নাগরিক আইনের চোখে সমানাধিকার পান।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাঁর ভাষণে ভারতের ‘কলেজিয়াম ব্যবস্থা’-র গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সংবিধান প্রণেতারা একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠনের ওপর জোর দিয়েছিলেন যা কার্যনির্বাহী বা সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকবে। এই প্রসঙ্গে সিজেআই বলেন, “এই সাংবিধানিক দর্শনকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই সুপ্রিম কোর্ট তার জুডিশিয়াল ডিক্টাম বা রায়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা মূলত বিচার বিভাগের হাতেই থাকবে এবং তা ‘কলেজিয়াম ব্যবস্থা’-র মাধ্যমে পরিচালিত হবে।” তিনি উল্লেখ করেন, এই স্বাধীনতা থাকার কারণেই ভারতীয় বিচার বিভাগ কেবল বিরোধ নিষ্পত্তি বা সাংবিধানিক সীমানা রক্ষাই করে না, বরং দেশের বৈচিত্র্যময় সমাজের গণতান্ত্রিক চেতনাকে সক্রিয়ভাবে রূপ দিতে সাহায্য করে।
বিচার ব্যবস্থার ওপর কোনো ধরণের চাপ বা প্রভাব যাতে কাজ না করতে পারে, তা বোঝাতে গিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি মহাভারতের একটি ঐতিহাসিক কাহিনীর উল্লেখ করেন। যেখানে রাজা প্রহ্লাদকে তাঁর নিজের পুত্র এবং একজন পণ্ডিতের মধ্যকার বিবাদে নিরপেক্ষ সালিশি বা বিচারকের ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল। এই উদাহরণের মাধ্যমে সিজেআই বলেন, “ন্যায়বিচার তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন বিচারক নিজে সমস্ত ধরণের বাহ্যিক চাপ এবং প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও বিচ্ছিন্ন থাকবেন, এবং যিনি কেবল দেশের আইন ও নিজের বিবেকের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে রায় দেবেন।”
প্রধান বিচারপতি বলেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকা ‘জুডিশিয়াল রিভিউ’ বা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ব্যাপক ক্ষমতাকে অনেকেই ভুলবশত বিচার বিভাগের একটি অতিরিক্ত ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করেন। কিন্তু তাঁর মতে, এটি কোনো ক্ষমতা নয়, বরং সংবিধানের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের কাঁধে সঁপে দেওয়া একটি পবিত্র কর্তব্য ও দায়িত্ব। এই দায়িত্বের কারণেই ভারতের ‘আইনের শাসন’ কেবল খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ কোনো সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের যাপিত জীবনের এক অস্বীকার্য বাস্তবতা।
তবে অন্যান্য স্তম্ভের ওপর নজরদারির পাশাপাশি বিচার বিভাগের নিজস্ব ‘লক্ষ্মণরেখা’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা বজায় রাখার ওপরও সমান জোর দিয়েছেন সিজেআই। তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশের আইনসভা বা কার্যনির্বাহী বিভাগ যখন কোনো জটিল প্রযুক্তিগত বা আর্থ-সামাজিক সিদ্ধান্ত নেয়, আদালত তখন কোনো দ্বিতীয় আপিল কর্তৃপক্ষ বা ‘সুপার এক্সিকিউটিভ’ (Super executive) হিসেবে তাদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে বসে না। তাঁর শেষ মন্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, “যখন দেশের সাংবিধানিক কাঠামো হুমকির মুখে পড়ে, তখন সাহসের সাথে কথা বলার মধ্যেই যেমন বিচার বিভাগের শক্তি নিহিত থাকে, ঠিক তেমনই সরকারের অন্য বিভাগের জটিল কাজে কখন হস্তক্ষেপ না করে সংযম দেখাতে হবে—সেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা বা জ্ঞান থাকাও সংবিধানের প্রতি বিশ্বস্ততার এক সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ।”
