ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: ১২ বছরের এক নাবালিকাকে অপহরণের পর ধর্ষণ ও খুনের নৃশংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর। রবিবার সকাল থেকে ধপধপি-২ পঞ্চায়েতের সূর্যপুর হাট সংলগ্ন এলাকায় তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ক্ষুব্ধ জনতা কুলপি রোড অবরোধ করে, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখায় এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টির জবাবে লাঠিচার্জ করতে হয় বিশাল পুলিশ বাহিনীকে। এই ঘটনার মাঝেই, মূল অভিযুক্ত সন্দেহে এক যুবককে ধরে গণপিটুনি দেয় উত্তেজিত জনতা, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিখোঁজ নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার বিকেলে সূর্যপুর হাটের বাড়ি থেকে খেলার জন্য বেরিয়েছিল ওই নাবালিকা। সন্ধ্যা পার হয়ে গেলেও সে বাড়ি না ফেরায় রাতভর আত্মীয়স্বজন ও আশেপাশের এলাকায় খোঁজাখুঁজি করে পরিবার। রবিবার সকালে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি পুকুরে নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় একটি দোকানের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখে পরিবারের দাবি, এলাকারই চার যুবক ওই নাবালিকাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়েছিল। নাবালিকার বাবা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “মেয়ে খেলতে গিয়ে আর ফেরেনি। সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে একদল যুবক ওকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আজ সকালে মেয়ের বস্তাবন্দি দেহ ভেসে উঠল। আমি আমার মেয়ের খুনিদের ফাঁসি চাই।” পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, গণধর্ষণের পর তথ্যপ্রমাণ লোপাট করতেই শ্বাসরোধ করে খুন করে দেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশি গাফিলতির অভিযোগ, অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি
দেহ উদ্ধারের পর থেকেই গ্রামবাসীদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ে প্রশাসনের ওপর। উত্তেজিত জনতা মৃতদেহ আটকে রেখে কুলপি রোডে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, পুলিশকে প্রথমে জানানো হলেও তারা তদন্তে গাফিলতি করে। বিক্ষোভকারীদের আরও গুরুতর অভিযোগ, গ্রামবাসীরা অভিযুক্তদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও, স্থানীয় এক বিজেপি নেতার কথায় পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।
এই খবর ছড়াতেই জনতা পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালায় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটবৃষ্টি শুরু করে, যার জেরে বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী জখম হন। আজাদ মন্ডল নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী বলছেন আইনের শাসন চলবে, আর শাসকদলের গুন্ডারা নাবালিকাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করছে! পশ্চিমবঙ্গে এই গুন্ডারাজ চলবে না।”
অভিযুক্তের গণপিটুনিতে মৃত্যু, পৃথক তদন্তে পুলিশ
উত্তেজিত জনতা এদিন সকালে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেয়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি (২৬) নামে এক অভিযুক্ত যুবককে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। বারুইপুর পুলিশ জেলার এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, “নাবালিকার পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মূল মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ইতিমধ্যেই দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে আইন হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনিতে মৃত্যুর যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটিও সম্পূর্ণ পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।” ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে বলে তিনি জানান।
“কাউকে ছাড়া হবে না, ফাঁসি দেব”: আইজি
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ঘটনাস্থলে পৌঁছন প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের আইজি কঙ্কনপ্রসাদ বারুই। তিনি সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার ও প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করার আপিল জানিয়ে বলেন, “এই নারকীয় ঘটনায় আমরা মর্মাহত। ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেককে গ্রেফতার করা হবে এবং আমরা ফাঁসির সাজা নিশ্চিত করব। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং মৃতের পরিবারকে ফোন করে আশ্বাস দিয়েছেন যে কাউকে রেয়াত করা হবে না।”
বর্তমানে এলাকায় চাপা উত্তেজনা থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র্যাফ মোতায়েন রাখা হয়েছে। নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় এদিন সন্ধ্যায় অ্যাডিশনাল এসপি পিনাকী দত্তের নেতৃত্বে একটি ৬ সদস্যের সিট গঠন করা হয়। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বাকিদের খোঁজে শুরু হয়েছে তল্লাশি। অন্যদিকে, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, পুলিশের উপর হামলা, অবরোধ, অভিযুক্তকে পিটিয়ে খুনের ঘটনায় একটি স্বতপ্রণোদিত মামলা রুজু করেছে পুলিশ।
“ভরসা ইন, ভয় আউট” স্লোগান নিয়ে তোপ নওসাদের
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের নতুন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণে বিঁধেছেন আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকী। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, “রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার দুই মাস পেরোতে না পেরোতেই ‘ভরসা ইন, ভয় আউট’ স্লোগান হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। বারুইপুরে এই মারাত্মক ঘটনার পর আবার পুলিশ অভিযুক্তকে ধরেও ছেড়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। ক্ষমতায় এসে নারী নিরাপত্তা নিয়ে ভুরি ভুরি প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল? অবিলম্বে সব অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।”
