TOP NEWS

ট্রমা কেয়ার জীবন ধারণের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ: পরিকাঠামো তৈরিতে রাজ্যগুলিকে সময় বেঁধে দিল সুপ্রিম কোর্ট

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: দেশের প্রতিটি নাগরিকের ‘ট্রমা কেয়ার’ বা জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার সংবিধানে বর্ণিত জীবন ধারণের মৌলিক অধিকারেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক যুগান্তকারী রায়ে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্ট দেশের সমস্ত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে আগামী ৩ মাসের মধ্যে আপদকালীন জরুরি পরিষেবার জন্য একটি অভিন্ন হেল্পলাইন নম্বর ‘১১২’ সম্পূর্ণ কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সাথে পথদুর্ঘটনায় আক্রান্তদের সাহায্যকারীদের সুরক্ষায় একটি কার্যকর ‘গুড সামারিটান’ বা ‘সহৃদয় ব্যক্তি’ সংক্রান্ত ক্ষোভ প্রশমন ব্যবস্থা গড়ে তোলারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে কে মাহেশ্বরী এবং বিচারপতি এ এস চন্দুরকরের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ ‘সেভলাইফ ফাউন্ডেশন’-এর দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে এই নির্দেশ পাস করে। ওই আবেদনে ভারতের পাবলিক ল বা জনস্বার্থ আইনি ব্যবস্থায় ট্রমা কেয়ারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। এদিন আদালত পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উল্লেখ করেছে, যখন কোনো ব্যক্তি পথদুর্ঘটনা বা এই জাতীয় কোনো মারাত্মক ঘটনার সম্মুখীন হন, তখন তাঁরা সাধারণত তীব্র মানসিক আঘাত, বিভ্রান্তি এবং এক ধরণের অসহায়ত্ব বোধ করেন। সেই মুহূর্তে তাঁরা কেবল আশা করতে পারেন যে আশেপাশের মানুষ কোনোভাবে তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। ডিভিশন বেঞ্চের ভাষায়, “এই ধরণের পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বা জরুরি পরিচর্যা ছাড়া কেটে যাওয়া প্রতিটি মিনিট আক্রান্ত ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। এমন সংকটকালীন মুহূর্তে দ্রুত পদক্ষেপ বা গতিই আক্ষরিক অর্থে ওষুধের মতো কাজ করে।”

আদালত আরও জানায়, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপকে মজবুত করতে একটি ‘বটম-আপ’ (তৃণমূল স্তর থেকে শুরু) পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে সমস্ত অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। শীর্ষ আদালত আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছে, সাধারণত আশেপাশের মানুষের মনে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করার তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা আইনি জটিলতা, সাক্ষী হিসেবে বারবার থানায় হাজিরা দেওয়ার ভয় এবং পরিস্থিতির মানসিক চাপের কারণে স্তব্ধ বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

এই বাধাগুলি দূর করতে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বার্তা, “এর জন্য প্রয়োজন একটি নিয়মতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ। ট্রমা কেয়ারের জন্য একটি অভিন্ন পরিকাঠামো তৈরি করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক চিকিৎসার দক্ষতার মানক নির্ধারণ এবং যথাযথ ‘গুড সামারিটান’ আইন প্রয়োগ করা জরুরি। কারণ নাগরিকদের ট্রমা কেয়ারের অধিকার ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (Article 21) অধীনে জীবন ধারণের অধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।” শীর্ষ আদালত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে আগামী তিন মাসের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

আদালত জানিয়েছে, ট্রমা কেসের ক্ষেত্রে কেন্দ্রকে আগামী ৩ মাসের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা উদ্ধার প্রোটোকল জারি করতে হবে এবং রাজ্যগুলিকে তার পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে তা মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করতে হবে। সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্সকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড-১২৫’ (AIS-125) মেনে চলতে হবে। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (GPS) বা ভেহিকল লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস (VLTD) থাকতে হবে এবং সেগুলিকে রিয়েল-টাইমে জরুরি হেল্পলাইন নম্বর ‘১১২’-এর সাথে যুক্ত করতে হবে। অ্যাম্বুলেন্সের রেসপন্স টাইম (ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময়), সেবার মান ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই করতে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। এছাড়াও, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রককে আগামী ৮ সপ্তাহের মধ্যে একটি ‘ট্রমা রেজিস্ট্রি’-র ডেটা ফরম্যাট সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করতে বলা হয়েছে। রাজ্যগুলি আগামী ৪ মাসের মধ্যে সমস্ত চিকিৎসা কেন্দ্রের ডেটা যুক্ত করে একটি সমন্বিত ট্রমা রেজিস্ট্রি তৈরি করবে।

আদালত কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিকে আগামী ১ মাসের মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বহুভাষিক প্রচার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। এই প্রচারের মূল বিষয়বস্তু হবে হেল্পলাইন ‘১১২’, মোটর যান আইনের ১৩৪এ ধারার অধীনে সাহায্যকারীদের আইনি সুরক্ষা এবং ক্যাশলেস বা বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রকল্প ‘পিএম রাহাত’। যে সমস্ত রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এখনও এই ক্যাশলেস চিকিৎসা প্রকল্প চালু করেনি, তাদের আগামী ৩ মাসের মধ্যে ‘পিএম রাহাত’ যোজনা সম্পূর্ণ কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্যগুলিকে প্রতি মাসে বৈঠক ডেকে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট তৈরি করতে হবে এবং সেই সভার কার্যবিবরণী নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করতে হবে। আগামী ৪ মাস পর সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার পরবর্তী অগ্রগতি খতিয়ে দেখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!