TOP NEWS

দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ধাবিত

——————————————————————————-

আমরা যখন কোনো সিনেমার গল্পে বুঁদ হয়ে যাই, তখন অবচেতনভাবেই সেই চরিত্রের হিরোইজম বা বীরত্ব আমাদের অবদমিত ইচ্ছেগুলোকে জাগিয়ে তোলে। ‘ক্রিশ’ বা ‘স্পাইডারম্যান’ হওয়ার চপল ইচ্ছা কিংবা ‘পুষ্পা’র মতো অনমনীয় হওয়ার জেদ—এ সবই মানুষের স্বভাবজাত অনুকরণপ্রিয়তা এবং কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “ইনফ্লুয়েন্স” বা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। আর এই মনস্তাত্ত্বিক সূত্রকে কাজে লাগিয়ে বাস্তবের জটিল মঞ্চে বিষাক্ত বীজ বপন করা হয়।

আজকের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ারটিকেই ব্যবহার করছে, তবে কোনো সুস্থ বিনোদন বা ইতিবাচক অনুপ্রেরণার জন্য নয়; বরং এক গভীর বিভাজনের রাজনীতি কায়েম করতে।

একটি উন্নয়নশীল দেশের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু টেলিভিশন স্ক্রিন খুললেই দিনরাত যে হিন্দু-মুসলিম বিতর্ক, ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা, কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের “স্ক্রিপ্ট” আমাদের সামনে পরিবেশন করা হয়, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। সিনেমার চরিত্রের মতো সাধারণ মানুষও যখন প্রতিদিন এই একই ঘৃণার আখ্যান দেখতে দেখতে তার গভীরে প্রবেশ করে, তখন তার অজান্তেই তার মগজধোলাই বা ব্রেনওয়াশ হয়ে যায়।

ফলাফলস্বরূপ, জনগণ নিজেদের মৌলিক অধিকার (যেমন—চাকরি, মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসা) নিয়ে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়। প্রতিবেশী বা সহনাগরিকের মধ্যে ‘বন্ধু’ খোঁজার বদলে ‘শত্রু’ খোঁজার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যুক্তি ও বিবেকের স্থান দখল করে নেয় অন্ধ আবেগ এবং ঘৃণা। “আমরা যা দেখি, আমরা তা-ই ভাবি। আর আমরা যা ভাবি, আমরা দিনশেষে তা-ই হয়ে উঠি।” সংবাদমাধ্যম যদি দিনরাত সমাজকে ভাঙার উপাদান সরবরাহ করে, তবে সমাজটাও একদিন সেই ভাঙনের চরিত্রেই রূপ নেবে।

মেরুকরণের এই সস্তা খেলায় ভোটব্যাংক ভারী হচ্ছে, টিভির ভিউ বাড়ছে। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত ভয়ানক। একটি বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যময় দেশের মূল ভিত্তি হলো তার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক মেলবন্ধন। সংবাদমাধ্যম যখন সেই ভিত্তিটাকেই কুরে কুরে খায়, তখন দেশের অদূর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। যে যুবসমাজের হাত ধরে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি হওয়ার কথা, তারা যদি বিদ্বেষের অন্ধগলিতে হারিয়ে যায়, তবে সেই ক্ষতি কোনো অর্থনৈতিক প্যাকেজ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হয় না।

সিনেমার কল্পজগৎ থেকে বের হয়ে আমরা যেমন আবার বাস্তবে ফিরে আসি, ঠিক তেমনি মিডিয়ার তৈরি করা এই ‘ঘৃণার ফ্যান্টাসি’ থেকেও দেশের মানুষকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। নাগরিকদের বুঝতে হবে—টিভি স্ক্রিনের ওপারে থাকা বিতর্কগুলো কোনো বাস্তব সমাধান নয়, ওগুলো কেবলই এক চতুর মায়াজাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!