কিবরিয়া আনসারী
কলকাতা: আসন্ন বাংলার বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত উৎসবের সময়—যেমন ঈদ বা দুর্গাপূজা—যে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার প্রবণতা দেখা যায়, এ বছর সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে নির্বাচনের আগে। তবে এই ফেরা উৎসবের আনন্দে নয়, বরং এক গভীর অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে—ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ভয়।
পরিযায়ী শ্রমিকেরা বছরের অধিকাংশ সময় ভিন রাজ্যে কাটান। জীবিকার সন্ধানে তারা ছড়িয়ে পড়েন দেশের নানা প্রান্তে। সাধারণত ঈদ, পূজা বা পারিবারিক প্রয়োজনেই তাঁরা বাড়ি ফেরেন। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বহু শ্রমিকের মধ্যে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ভোট না দিলে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে। এই ভয়ই তাঁদের দলে দলে রাজ্যে ফিরতে বাধ্য করছে। সেই কারণে চাপ বাড়ছে ট্রেনেও। অনেকে টিকিট না পেয়ে বাসে করে রাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কেরলে কর্মরত বাংলার ভোটাররা। শেষ মুহূর্তে বেসরকারি বাস পরিষেবার উপর ভরসা রাখছেন তাঁরা। বহু শ্রমিক অভিযোগ করছেন, আগেভাগে চেষ্টা করেও তাঁরা ট্রেনের টিকিট পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা বাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
কেরলে কর্মরত বহু বাঙালি শ্রমিক এখন বেসরকারি বাস পরিষেবার উপর নির্ভর করছেন। তিরুঅনন্তপুরম থেকে বাংলাগামী ট্রেনগুলিতে আর কোনও টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। কেবলমাত্র যারা আগে থেকে টিকিট কেটেছিলেন, তাঁরাই ট্রেনে ফিরতে পারছেন। এই রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলির মধ্যে রয়েছে শালিমার সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস, ডিব্রুগড় বিবেক এক্সপ্রেস, টিভিসি এসসিএল এক্সপ্রেস, গুরুদেব সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস, সিবিই এসসিএল সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস এবং অরোনাই এক্সপ্রেস—তবুও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল।
চারদিনের যাত্রা শেষে বাড়ি ফেরা
গণতন্ত্রের উৎসবে সামিল হতে চেয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া থানার বাসিন্দা সামশুজ্জোহা সরকার। চেয়েছিলেন নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে। কিন্তু ভিন রাজ্য থেকে নিজের জেলায় ভোট দিতে ফিরতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন, তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া থানার বাসিন্দা। ট্রেনের টিকিট না পাওয়া থেকে শুরু করে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া— সব মিলিয়ে চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিক।
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে মহারাষ্ট্রের পুনেতে কর্মরত সামশুজ্জোহা। কাজের প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াত করেন। তবে এবারের ফেরাটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। ‘ডেইলি ডোমকল’-কে তিনি জানান, ভোট দেবেন বলে এক মাস আগেই ট্রেনের টিকিট কাটার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মেলেনি কনফার্ম টিকিট। নিরুপায় হয়ে জেনারেল কামরাতেই আসার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। শ্রমিকের কথায়, স্টেশনে গিয়ে দেখেন ট্রেনের কামরায় তিল ধারণের জায়গা নেই। ভিড়ের চাপে ট্রেনে ওঠাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে সরাসরি বাড়ি ফেরার আশা ছেড়ে ওড়িশাগামী একটি ট্রেনে ওঠেন তিনি। সেখান থেকে বাসে করে কলকাতা এবং পরিশেষে ফের বাসে চড়ে পৌঁছান নিজের গ্রাম সাগরপাড়ায়। যেখানে বাড়ি ফিরতে খরচ হওয়ার কথা ছিল ২ হাজার টাকা, সেখানে ঘুরপথে আসতে গিয়ে পকেট থেকে খসেছে ৬ হাজার টাকা।
ট্রেন পেলে একদিনেই বাড়ি পৌঁছাতে পারতেন, কিন্তু বাস ও ভিন্ন ট্রেনের চক্করে কয়েকদিন সময় লেগেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের প্রবাস জীবনে এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখে আগে কখনও পড়তে হয়নি তাঁকে। সামশুজ্জোহা বলেন, “এবার জীবনে বড় শিক্ষা হলো। ট্রেনের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে উঠতেই পারলাম না। বাধ্য হয়ে ঘুরে ঘুরে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। সরকারের কি আমাদের মতো মানুষের জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা উচিত নয়?” সামশুজ্জোহার এই প্রশ্ন এখন বহু পরিযায়ী শ্রমিকের। ভোটের সময় যখন রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের দুয়ারে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, তখন ভোট দিতে আসা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের নূন্যতম ব্যবস্থা কেন সুনিশ্চিত করা হলো না, তা নিয়ে প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। এই “বড় শিক্ষা” শুধু সামশুজ্জোহার নয়, বরং পরিকাঠামোর দৈন্যদশা আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
ভোট না দিলে নাম কাটার আতঙ্ক
মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু কিংবা কেরল— কাজের সূত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গৃহকর্মী, আয়া, রাঁধুনি বা দিনমজুররা এখন যেভাবেই হোক বাড়ি ফিরতে মরিয়া। তবে এই ফেরার নেপথ্যে উৎসবের আনন্দের চেয়েও বেশি কাজ করছে এক অজানা আতঙ্ক। শোনা যাচ্ছে, এবার ভোট না দিলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যেতে পারে— এমন একটি জল্পনা ছড়িয়েছে শ্রমিক মহলে। আর সেই নাম কাটা যাওয়ার ভয়েই শয়ে শয়ে শ্রমিক ভিন রাজ্য থেকে বাংলার পথে পা বাড়িয়েছেন। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো বার্তার সত্যতা মেলেনি, তবে সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে বসা এই আতঙ্কই এখন স্টেশন ও বাস টার্মিনাসগুলোতে উপচে পড়ছে ভিড়।
কেরলের তিরুঅনন্তপুরম থেকে বাংলাগামী ট্রেনগুলোর অবস্থা শোচনীয়। আগামী বেশ কিছুদিন কোনো ট্রেনেই আর টিকিট অবশিষ্ট নেই। একমাত্র যাঁরা অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে টিকিট কেটে রেখেছিলেন, তাঁরাই কোনোমতে ফিরতে পারছেন। বাকিদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ।
ট্রেনের টিকিট না পেয়ে নাজেহাল শ্রমিকদের একাংশ এখন বিকল্প হিসেবে বাসের ওপর ভরসা করছেন। বেসরকারি বাসে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও অনেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন। “ট্রেনে ওঠার জায়গা নেই, টিকিট তো দূরের কথা। শুনছি ভোট না দিলে নাকি নাম কেটে দেবে, তাই বাধ্য হয়ে বাসে করেই রওনা দিচ্ছি। পকেটের টাকা বেশি গেলেও নামটা তো বাঁচাতে হবে,” আক্ষেপের সুরে জানালেন এক পরিযায়ী শ্রমিক।
মুর্শিদাবাদের হাজার হাজার শ্রমিকের এই দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের ছবি। বিশেষ ট্রেনের অভাব এবং যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। প্রশ্ন উঠছে, গণতন্ত্রের এই মহোৎসবে সামিল হতে চাওয়া মানুষদের জন্য কেন বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে না রেল বা সরকার?
৪ থেকে ৬ হাজার টাকা ভাড়া
রেলের টিকিট নেই, লম্বা ওয়েটিং লিস্টের অনিশ্চয়তা আর স্টেশনে স্টেশনে উপচে পড়া ভিড়। একসময় এই প্রতিকূলতা দেখে অনেকেই হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন হয়তো এবার আর ভোট দেওয়া হবে না। ট্রেনের বিকল্প হিসেবে এখন কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বেসরকারি বাসে চেপেই গ্রাম বাংলার পথে রওনা দিচ্ছেন শয়ে শয়ে পরিযায়ী শ্রমিক। দক্ষিণ ভারতের কেরল, বিশেষ করে এর্নাকুলাম জেলার পেরুম্বাভুর, কোথামঙ্গলম এবং মুভাট্টুপুঝা এলাকা থেকে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু বেসরকারি বাস শ্রমিকদের নিয়ে বাংলার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। জানা গিয়েছে, ভোট দেওয়া হয়ে গেলে এই বাসগুলোতেই আবার শ্রমিকরা কর্মস্থলে ফিরে যাবেন।
নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে রওনা দিয়েছেন এক পরিযায়ী শ্রমিক। তাঁর কথায় উঠে এল এক দৃঢ় জেদ এবং অসহায়তার ছবি। তিনি বলেন, “ট্রেনের টিকিট কনফার্ম হওয়ার কোনো আশাই নেই। কিন্তু আমরা ঠিক করেছি ভোট দিতে যাবই। কাজ গেলে যাক, তাতে কিছু যায় আসে না। আমার মতো আরও কয়েকশো মানুষ এখন বাংলার পথে।”
ট্রেনে যেখানে নামমাত্র খরচে যাতায়াত করা যায়, সেখানে বাসে করে ফিরতে গিয়ে শ্রমিকদের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে মোটা অংকের টাকা। বাসের ধরন অনুযায়ী ভাড়ার অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। নন-এসি বাসে ৪,০০০ টাকা, এসি বাসে ৫,০০০ টাকা ও স্লিপারে ৬,০০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এক বাস অপারেটর জানিয়েছেন, ইদ ও দুর্গাপুজোর সময় বহু বছর ধরেই তিনি কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং শিলিগুড়িতে বাস চালান। এবার ভোটের কারণে শ্রমিকদের অনুরোধে ১০০-র বেশি বাস চালানো হয়েছে। তবে এই পরিষেবা চালাতে গিয়ে সমস্যার মুখেও পড়তে হচ্ছে বাস মালিকদের। অভিযোগ, বাংলা-ওড়িশা সীমান্তে প্রতি ট্রিপে ৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। সেই কারণে তাঁদের লাভ কম হচ্ছে। এছাড়া শ্রমিকদের ফেরত আনার জন্য বাংলায় প্রায় ১০ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাসগুলিকে।
গত এক সপ্তাহ ধরে শিয়ালদহ স্টেশনে লালগোলামুখী প্রতিটি ট্রেনেই তিল ধারণের জায়গা নেই। উত্তরবঙ্গ বা মুর্শিদাবাদগামী ট্রেনের ভিড় দেখে যে কেউ উৎসবের মরসুম বলে ভুল করতে পারেন। কিন্তু এই ভিড়ের নেপথ্যে রয়েছে নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে শ্রমিকদের মনের গভীর উদ্বেগ। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকর্তাদের মতে, এবারের ভোটে একটি বিশেষ প্রভাব কাজ করছে। ভোটার তালিকা থেকে অনেকের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাঁদের ধারণা, একবার যদি ভোটদান থেকে বিরত থাকেন, তবে ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম চিরতরে মুছে যেতে পারে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘নাগরিকত্ব’ আতঙ্ক
লালগোলার বাসিন্দা ফরিদ শেখ জানান, “চারিদিকে শুনছি বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। এবার ভোট দেওয়াটা আমাদের কাছে খুব দরকারি। যদি ভোট না দিলে সরকার আমার নামটা কেটে দেয়? সেই ভয়েই আমার মতো আরও অনেকে কাজ ফেলে বাড়ি ফিরছে।”
সামশেরগঞ্জের পরিযায়ী শ্রমিক রবিউল সেখ বলেন, “আমরা পেটের তাগিদে ঘর ছাড়েন। সেই জীবন এমনিতেই অনিশ্চয়তায় ভরা। এখন আমাদের উপার্জিত সামান্য অর্থ খরচ করে, কয়েক দিনের রোজগার নষ্ট করে কেবল নাম বাঁচানোর তাগিদে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। এটি আমাদের অর্থনৈতিক ও মানসিক পরিস্থিতির ওপর এক চরম আঘাত। রাজনৈতিক দলগুলো যখন এই ‘ভোটব্যাঙ্ক’ নিয়ে দড়ি টানাটানি করে, তখন আমাদের এই অসহায়ত্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। আমরা এখানে কোনো আদর্শের টানে আসছি না, আসছি স্রেফ নিজের ভিটেমাটি বা নাগরিকত্বের অধিকার হারানোর আশঙ্কায়।”
কেরল ফেরত ডোমকলের রাজিবুল মন্ডল বলেন, “যতক্ষণ না সাধারণ মানুষের মন থেকে ‘নাম বাদ পড়া’ বা ‘নাগরিকত্ব হারানো’র ভয় দূর হচ্ছে, ততক্ষণ এই গণতন্ত্র কেবল নামেই ‘উৎসব’ থাকবে। আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মরণপণ লড়াইয়ে করে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।”
কেনো স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা হল না? প্রশ্ন
এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পরিযায়ীদের ভোট দিতে ঘরে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছেন। ঘরে ফিরতে রাজনৈতিক দলগুলি স্পেশাল ট্রেন বা বাসের জন্য কোনও দাবি জানায়নি। এনিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাহুল চক্রবর্তী ‘ডেইলি ডোমকল’-কে বলেন, “আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বাইরে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে তৎপরতা। জীবিকার ঝুঁকি নিয়ে অনেকে বাংলায় ফিরছেন শুধুমাত্র ভোট দিতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজের জন্য বহু শ্রমিকরা মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু বা কেউ হায়দারাবাদে থাকেন। এসআইআর নিয়ে তৈরি হওয়া আতঙ্ক তাদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সবচেয়ে উদ্বেগে বিষয়, যাদের ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়, তাদের বাড়ি ফেরার জন্য সরকার কোনও স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করেনি। বিপুল পরিমাণে পরিযায়ী শ্রমিকরা বাংলায় ফেরার প্রস্তুতি নিতেই দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিটগুলি ইতিমধ্যেই ওয়েটিংয়ে চলছে।”
রাহুলের কথায়, “বহু পরিযায়ী শ্রমিক আশঙ্কা করছেন, ভোট না দিলে হয়তো ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়বে। অনেকেই মনে করছেন ভোট না দিলে হয়তো নাগরিকত্ব থেকে তাদের নাম বাদ যাবে। ভোটের আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের এই ব্যাপক ঘরে ফেরা শুধু নির্বাচনী আবহই নয়, সমাজের এক বাস্তব ছবিও তুলে ধরছে। জীবিকার অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভোট দিতে ফেরার এই প্রবণতা নিজেদের উপস্থিতি ও গুরুত্ব বোঝানোর একটি বাস্তব চিত্র।”
পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ
যে সমস্ত বাসে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরছেন, সে রকম একাধিক বাস ওড়িশা সীমান্তে আটকে দিয়েছে রাজ্য সরকার। বাসে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণ দেখিয়ে বাসগুলি আটকে রাখা হয়েছে বলে খবর। পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের রাজ্য সম্পাদক আসিফ ফারুক ‘ডেইলি ডোমকল’-কে জানান, “পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নাম তোলা এবং সেই নাম টিকিয়ে রাখার তাগিদে ভিন রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার এই হিড়িক কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশের লক্ষণ নয়। বরং এটি সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে থাকা এক গভীর ‘অস্তিত্ব রক্ষার আতঙ্ক’ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ।”
আসিফ ফারুকের বক্তব্য, “ভোটার তালিকায় নাম থাকা মানে কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে নাগরিকত্ব প্রমাণের এক পরোক্ষ রক্ষাকবচ। এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনের পর মানুষের মনে এই ভয় প্রবলভাবে কাজ করছে যে, একবার ভোট দিতে না পারলে তাঁদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘নিখোঁজ ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হতে পারে। এই ভয়টি স্বাভাবিক নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সাধারণ মানুষের মনে এই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।”
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
সমাজকর্মী আব্দুল গনি বলেন, “একজন নাগরিক দেশের যেকোনো প্রান্তে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে পারেন, এটাই সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। কিন্তু কর্মস্থলের হাজার মাইল দূরে কেবল ‘নাম কাটা যাওয়ার ভয়ে’ ভোট দিতে আসা প্রমাণ করে যে, আমাদের নির্বাচন কমিশন এবং শাসনব্যবস্থা আজও সাধারণ মানুষকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় অংশই ভোটের সময় বাড়ি ফিরতেন না। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ‘ভোটাধিকার’ তাঁদের কাছে শুধুমাত্র একটি কর্তব্য নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ট্রেনের টিকিট না পাওয়া বা বাসে কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করাকেও তাঁরা আর বাধা হিসেবে দেখছেন না। রেল স্টেশনের এই উপচে পড়া ভিড় আজ কেবল বাড়ি ফেরার গল্প নয়; এ এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। আগামী কয়েক দফায় এই ভিড় আরও বাড়বে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি নির্বাচনী ঘটনার ইঙ্গিত নয়—এটি সমাজের এক গভীর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের এই ব্যাপক ঘরে ফেরা যেমন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রতীক, তেমনি এটি ভয়, অনিশ্চয়তা ও অব্যবস্থাপনার এক জটিল চিত্রও তুলে ধরছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে এবারের ভোট জেনো—কেবল গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ নয়, বরং অস্তিত্ব প্রামণের লড়াই হয়ে উঠেছে।
