ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ অত্যন্ত উৎসাহ, উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপন করল ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান উৎসব পবিত্র ঈদুজ্জোহা বা কোরবানি ঈদ। মহান আল্লাহর প্রতি হজরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর গভীর আনুগত্য এবং তাঁর পুত্রকে কোরবানি দেওয়ার চরম ত্যাগকে স্মরণ করে প্রতি বছর এই উৎসব পালিত হয়। বুধবার বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায় ঈদের বিশেষ নামাজ, পশু কোরবানি, দান-খয়রাত এবং প্রিয়জনদের সাথে পারস্পরিক মিলনের মধ্য দিয়ে এই পবিত্র দিনটি অতিবাহিত করেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, সামর্থ্যবান মুসলিম পরিবারগুলি ভেড়া, ছাগল বা গোরু কোরবানি দেন এবং সেই মাংস আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের অভাবী মানুষের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
সৌদিতে সমাপ্তির পথে পবিত্র হজ
ঈদুজ্জোহা বা বকরি ঈদ সৌদি আরবের বার্ষিক হজ তীর্থযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাপক নিরাপত্তা ও উন্নত পরিষেবার মধ্য দিয়ে গত সোমবার থেকে মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রার মাধ্যমে এবারের হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল। মঙ্গলবার আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক ‘ওয়াকফাহ’ বা অবস্থানের মূল আচার সম্পন্ন হয়। রাতে মুজদালিফায় রাত্রিযাপন এবং কঙ্কর (পাথর) সংগ্রহ। বুধবার থেকে মিনায় জামারাতে শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ এবং কোরবানি করা হয়। মক্কার গ্র্যান্ড মস্ক বা কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে এই পবিত্র সফর সমাপ্ত হবে।
এশিয়া থেকে বলকান: নামাজের চাদরে ঢাকল বিশ্ব
তুরস্ক (তুর্কিয়ে) থেকে শুরু করে সেন্ট্রাল এশিয়া ও বলকান অঞ্চলের দেশগুলিতে ভোর থেকেই ঈদের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক হাগিয়া সোফিয়া গ্র্যান্ড মস্ক এবং সুলতান আহমেদ (ব্লু মস্ক) মসজিদে সকাল থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিদেশি পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। নামাজের পর একে অপরকে কোরবানি ঈদের শুভেচ্ছা জানান। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুসহ সারা দেশের মসজিদগুলি ভোর থেকেই মুসল্লিদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জায়গা না পেয়ে অনেকেই মসজিদের উঠোন, বাগান এবং সংলগ্ন রাস্তায় নামাজ আদায় করেন। শেকি শহরের ঐতিহাসিক জুমা মসজিদেও বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তানে ইমামরা কোরবানি ও ভ্রাতৃত্বের তাৎপর্য নিয়ে খুতবা দেন। অন্যদিকে, কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকের বিখ্যাত ‘আলা-তু’ স্কয়ার এবং ওল্ড স্কয়ারে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের জায়নামাজ বিছিয়ে খোলা আকাশের নীচে ঈদের নামাজ পড়েন। বলকান অঞ্চলের বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো, ক্রোয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, আলবেনিয়া এবং কসোভোর মতো বলকান দেশগুলিতেও বিপুল উৎসাহের সাথে ঈদ উদযাপিত হয়েছে।
আল-আকসায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মুসল্লি
ইসরায়েলি পুলিশের কঠোর নজরদারি ও কড়া বেষ্টনী উপেক্ষা করে অধিকৃত জেরুজালেমের ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদে সমবেত হয়েছিলেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগ জানিয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও এবার আল-আকসা মসজিদে আনুমানিক ১ লক্ষ ৪০ হাজার মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, মিশর, ফিলিস্তিন এবং সিরিয়াসহ প্রায় ১১টি আরব দেশে ঈদের নামাজে দেশের শীর্ষনেতারা অংশ নেন। প্রতিটি দেশের খুতবা ও মোনাজাতে ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।
যুদ্ধবিরতির আবহেও ম্লান ঈদের আনন্দ
এবারের ঈদ এমন এক সময়ে এলো যখন অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং গাজা ভূখণ্ডের লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনিকে ধ্বংসস্তূপের মাঝে ঈদ কাটাতে হচ্ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ক্ষত এখনও দগদগে। গাজায় ইসরায়েলের চালানো সেই বিধ্বংসী অভিযানে ১ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়ে গিয়েছে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক পরিকাঠামো। ফলে যুদ্ধ থামলেও শান্তি ও স্বজন হারানোর বেদনা নিয়েই এবার কাটল ফিলিস্তিনের কোরবানি ঈদ।
